রাজশাহীতে এক বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জন
থামছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
৩০-০৮-২০২৬ ১২:৪৫:০৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
৩০-০৮-২০২৬ ০১:১০:৩৮ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
রাজশাহীতে দিনের বেলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভারী ট্রাক। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনা। গত এক বছরে জেলায় ১৬৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জন। এসব দুর্ঘটনার পেছনে ট্রাক ও বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ট্রাক নয়, মোটরসাইকেলও দুর্ঘটনার বড় একটি কারণ।বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন অমান্য, অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং দুর্বল তদারকির কারণেই সড়কে প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ।
চলতি বছরের ৫ মে রাজশাহীর একটি সড়ক দুর্ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ এলাকায় ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় এক দোকানি নিহত হন। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ জনতা দুটি ডাম্প ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সড়কে দীর্ঘদিন ধরে ডাম্প ট্রাকগুলো অতিরিক্ত গতিতে ও নিয়ম না মেনে চলাচল করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এর আগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি একই মহাসড়কের ঝলমলিয়া বাজারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বালুবাহী ট্রাক বাজারের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই চার জন নিহত হন এবং আহত হন আরও কয়েকজন। ২৬ জানুয়ারি বেলপুকুর এলাকায় বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিন জন। বছরের শুরু থেকেই ধারাবাহিক এসব দুর্ঘটনা রাজশাহীর সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
রাজশাহী জেলা পুলিশ ও মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরে জেলায় ১৩৫টি এবং মহানগরে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় মোট ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দুর্ঘটনা নিয়ে ১৬৯টি মামলা হয়েছে।পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এ ছাড়া প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ট্রাক বা ডাম্প ট্রাকের কারণে।
সড়ক সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ অতিরিক্ত গতি ও ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। অনেক চালকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স নেই। আবার অনেক যানবাহনের ফিটনেসের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ডাম্প ট্রাক নিয়ে অভিযোগ বেশি।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক ডাম্প ট্রাক ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বালু বা মাটি বহন করে। এতে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ব্রেক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ট্রাকে বালু বা মাটি ঢেকে রাখার জন্য সুরক্ষা কভারও ব্যবহার করা হয় না। ফলে চলন্ত অবস্থায় ধুলাবালি উড়ে অন্য যানবাহনের চালকদের দৃষ্টিসীমা কমিয়ে দেয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু ডাম্প ট্রাককে দায়ী করা ঠিক নয়। বাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহনই দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত। দুর্ঘটনা ঘটলেই যানবাহনে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুর করাও আইনসম্মত নয়। প্রতিটি দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
রাজশাহীতে বর্তমানে ৮৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৪৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে। সড়কের পরিমাণের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা সেই হারে উন্নত হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজশাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আলামিন সরকার টিটু বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। মহাসড়কে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ভটভটির জন্য আলাদা লেন বা সড়ক না থাকায় এসব যানবাহন অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করছে। এসব চালকের অনেকেরই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নেই। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে।’ তিনি বলেন, ‘মহাসড়কের পাশে সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা ও হাটবাজার গড়ে ওঠায় সড়ক সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। এটিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। দেশে অদক্ষ চালকের সংখ্যাও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চালকের পরিবর্তে হেলপারকে দিয়ে গাড়ি চালানো হয়। এর সঙ্গে বেপরোয়া গতি ও অতিরিক্ত মালামাল বহনও দুর্ঘটনার কারণ।’ আলামিন সরকার টিটুর ভাষ্যমতে, মহাসড়কগুলো ধাপে ধাপে চার লেনে উন্নীত করা এবং ইজিবাইক ও অটোরিকশার জন্য পৃথক লেন বা সড়কের ব্যবস্থা করা হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ রাজশাহী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। যেখানে প্রশস্ত সড়ক প্রয়োজন, সেখানে এখনও পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। যেসব স্থানে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, সেগুলোর অধিকাংশই এক লেনের সড়ক। পাশাপাশি চালকদের অসাবধানতা এবং বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সচেতনতার অভাব। ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে পারলেই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজশাহীর সড়কগুলো অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর উপযোগী নয়। তাই গতি নিয়ন্ত্রণ করে গাড়ি চালানো উচিত। এসব সড়কে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগ নিরাপদ। এর বেশি গতিতে চললে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সরকারের কার্যকর উদ্যোগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।’
এ ব্যাপারে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ সাধারণ মানুষের পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব। পাশাপাশি অনেক চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই যানবাহন চালাচ্ছেন। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ নিয়মিত বিভিন্ন কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এসব উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে।’ মোটরসাইকেল, ডাম্প ট্রাক, ট্রাক ও অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের সম্পৃক্ততায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনা কমাতে চালক ও পথচারী—উভয়ের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরাও ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কাজ করছি।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স